ফড়িংয়ের পায়েশ।। ছোটগল্প।।নাসীমুল বারী।।

ফড়িংয়ের পায়েশ
।। নাসীমুল বারী।।

“কুয়াশার পায়েশ রেঁধেছি। দেখোনা ঘাসের প্লেটে কেমন সাজানো আছে। এসো এসো! একটু বসো।”

এক নাগারে মৌমাছিকে কথাগুলো বলল ফড়িংটা। মৌমাছিও গুনগুনিয়ে গান গেতে গেতে ফড়িংটার কাছে এসে বলে, তোমার পায়েশ তো বেশ দেখতে! কিন্তু…

-কিন্তু কী?

-ওতে মিষ্টি নেই। মিষ্টি ছাড়া তো আবার আমার চলে না।

-তাতে কী! আমি তো এই-ই আয়োজন করতে পারি। দিনে হলে না হয় ঘাসফুলের সবজি দিতে পারতাম! কিন্তু সূয্যি ওঠার এ সকালে…

-না, আপু না। আর কিছু দিতে হবে না। আমি ওতেই খুশি।

-কাছে এসো। বসো।

-না রে আপু। আমার যে সময় নেই। আমার সাথে যাবে? সরষেপুডিং খাওয়াবো। খুব মিষ্টি। আর গান তো শুনাবোই।

-ইস ও গান গায় বলে ওর এতো কদর? বলি আমার বিছানায় তোমার কুয়াশার পায়েশ কেন?

খুব তেড়ে এসে মাকড়শা ফড়িংকে বলে। সাথে সাথেই মৌমাছি বলে, তুমি ওর ঘাসের এলাকায় বিছানা পাতলে হবে? ওর কুয়াশার পায়েশ তো সব জায়গায় ছড়াবেই। তুমি বরং একটা কাজ করো।

আগ্রহ নিয়ে মাকড়শা জিজ্ঞেস করে- কী?

-তুমি গাছের পাতায় তোমার বিছানা পাতো।

-বললেই হলো! আমার জায়গা এটাই।

-ঝগড়া করবে তুমি?

মৌমাছি জিজ্ঞেস করে। সাথে সাথে ফড়িং বলে, ও এমনই।

-ঝগড়া কেন? আমরা ছোট। আমাদের এমন ঘাসেই ছোট ছোট বিছানা বানাতে হয়। আমি আমার কথাটাই বললাম। এটাই ঝগড়া?

মাকড়শা বলে।

-ও তাই বুঝি!

মৌমাছি একটু চমকে বলে।

তখনই লাফ দিয়ে ফড়িং মাকড়শার ডান পাশে গিয়ে বলে, কী করব বলো? আমার এই কুয়াশার পায়েশ তো পুরো ঘাস জুড়েই রাখতে হয়। রাগ করো না লক্ষ্মী আপু। আচ্ছা দিনে না হয় ঘুমিয়ে নিও।

-দিনে! দিনে ঘুমাবো! এটা তো অলসের কাজ। দিনে ঘুমালে খাবার পাবো কই?

অমনি মৌমাছি বলে, ফড়িং আপু তুমি বড্ড বোকা। দিন হলো কাজের সময়। এ সময় কি কেউ অলস থাকতে পারে? ঘুমাতে পারে?

-তোমরাও তো দিনভরে ঘুমাও।

ফড়িং মৌমাছিকে বলে।

-না আপু, না। আমরা এ সকালে বেরিয়েছি মধু যোগাড় করতে। তারপর তা নিয়ে দিনভর আমাদের চাকে সাজাব। কারো যতি কমতি হয়, সে আবার বের হবে। কাজ হয়ে গেলেও আবার বের হবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি আমাদের এই কাজ।

ফড়িং একটু লজ্জা পেয়ে যায়। লজ্জাবনত স্বরে মাকড়শাকে বলে, দুঃখিত তোমাকে খাবার বাদ দিয়ে ঘুমুতে বলেছি।

-ঠিকই কাউকে তার কাজের জন্য নিরুৎসাহিত করতে নেই।

কথাটা বলেই মৌমাছি আবার বলে, গেলুম আমি। ওই সরষে ক্ষেতে যেতে হবে। আজ আমার অনেক মধু যোগাড় করতে হবে। রানি-মার আদেশ। ক’বার যে আসি, কে জানে!

-রানি মা! সে কে?

চমক নিয়ে ফড়িং-মাকড়শা দুজনেই জিজ্ঞেস করে। মৌমাছিও খিলখিলিয়ে হেসে দিয়ে বলে- সেটা জানো না! আমাদের রাজ্যের রানি। তিনিই তো আমাদের মা।

-সে কি! তোমাদের আবার রাজা রানি আছে?

-হাঁ, আছে। রানি মা। রানির আদেশ আমাদের মেনে চলতে হয়। আমরা তার সব আদেশ মেনে চলি। রাজ্যের আদেশে কোনোই ফাঁকি দেই না আমরা। দেখ না আমরা সবাই এক সাথে মিলে মিশে থাকি।

ফড়িং-মাকড়শা দুজনেই চমকে বলে, তাই তো!

-মিলে মিশে থাকার মাঝে কতো আনন্দ, কতো মজা! তোমরা সবাই মিলে মিশে থেকো কেমন?

কথাটা বলেই মৌমাছি মনের আনন্দে গুনগুনিয়ে গান গেতে গেতে চলে যায় সরষে ক্ষেতের দিকে।

২৩ অক্টোবর, ২০১৮

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart